রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

আট বছরে ৩২০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা হারিয়েছে বড় কোম্পানিগুলো

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে রয়েছে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে যুদ্ধ, বাণিজ্যিক টানাপড়েন ও মেরুকরণ, মূল্যস্ফীতি বা মন্দার মতো ঘটনা। এ ধরনের অনিশ্চয়তার কারণে সর্বশেষ আট বছরে (২০১৭-২৪) বিশ্বজুড়ে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ৩২০ বিলিয়ন ডলার (৩২ হাজার কোটি) মুনাফা হারিয়েছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। খবর এফটি।

বিগ ফোর নামে পরিচিত বৈশ্বিক পরামর্শক সংস্থাগুলোর একটি আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াং (ইওয়াই)। প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত বিশ্লেষণ শাখা ইওয়াই-পারথেনন সম্প্রতি এক গবেষণায় গত আট বছরে বিশ্বব্যাপী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাজনিত আর্থিক ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ করে।

এজন্য বার্ষিক ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এমন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ইওয়াই-পারথেনন। যেখানে দেখা যাচ্ছে, কোম্পানিগুলো ভূরাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সম্মিলিতভাবে ৩২ হাজার কোটি ডলার মুনাফা হারিয়েছে।

ইওয়াই-পারথেনন ইউকের ম্যাক্রো অ্যান্ড জিওস্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান ম্যাটস পারসন বলেন, ‘কম সুদনির্ভর অর্থনীতি ও তুলনামূলক স্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক সময় পেরিয়ে এখন নতুন এক বাস্তবতায় পৌঁছে গেছি আমরা। যেখানে বাণিজ্য উত্তেজনা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সংঘাত পর্যন্ত নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারি নীতি ও বৈশ্বিক ঘটনা এখন এমনভাবে কোম্পানির বাজারমূল্য ও মুনাফার ওপর প্রভাব ফেলছে, যা গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি।’

গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে একাধিক ঘটনা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাবর্তন, ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ, যুক্তরাজ্যে সরকারি বন্ড বা গিল্ট মার্কেট বিপর্যয়, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তন। এ সময়ে বড় অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাবে এফটিএসই ১০০ সূচকের মোট মূল্য পরিবর্তনের প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটেছে।

বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত আট বছরের মধ্যে কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শেষ তিন বছরে (২০২২-২৪)। এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বিশ্লেষিত কোম্পানির মধ্যে প্রতি চারটির একটি অর্থাৎ ২৫ শতাংশ তাদের সুদ, কর, অবচয় ও অবলোপন-পূর্ববর্তী মুনাফা (ইবিআইটিডিএ) ৫ শতাংশ বা তার বেশি হারিয়েছে।

এ সময় মুনাফা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে চীনের কোম্পানিগুলো। ইওয়াই-পারথেননের বিশ্লেষণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি থেকে ৮৩৩ কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ সম্মিলিতভাবে ৭৩ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ইবিআইটিডিএ হারিয়েছে। কভিড-পরবর্তী সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একসময়ের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি রিয়েল এস্টেট খাতের পতন।

ম্যাট পারসনের কথায়ও এর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। এ বিশ্লেষকের মতে, এ ক্ষতি প্রধানত চীনের রিয়েল এস্টেট, স্টিল ও নির্মাণ খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে সরকারি সহায়তার অপর্যাপ্ততা বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় উঠে এসেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। ১০০টি কোম্পানি গবেষণার নির্ধরিত ন্যূনতম ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয়সীমা পূরণ করেছে। এর মধ্যে ১৪টি কোম্পানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইবিআইটিডিএ মার্জিন পতনের সম্মুখীন হয়েছে। গত তিন বছরে কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে ২৫০ কোটি ডলার মুনাফা হারিয়েছে। তবে কিছু কোম্পানি ম্যাক্রো অর্থনীতি বা অর্থনৈতিক কাঠামো, নীতি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন সত্ত্বেও নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছে। তারা একই খাতের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি মুনাফা অর্জন করেছে।

আবার শীর্ষ কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা অর্জনের হার একইভাবে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৪ সালে ইবিআইটিডিএ মার্জিনের দিক থেকে যেসব বৈশ্বিক কোম্পানি শীর্ষ ২৫ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ বা প্রতি ১০টির একটি কোম্পানি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সে অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

এ অনিশ্চয়তার মাঝেও যুক্তরাজ্যে যেসব কোম্পানি আয় বাড়াতে পেরেছে তাদের মধ্যে রয়েছে ফ্যাশন পণ্যের খুচরা বিক্রেতা নেক্সট, কেমিক্যাল কোম্পানি ক্রোডা, খনিজ কোম্পানি রিও টিন্টো ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ স্পাইরাক্স, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাটারপিলার, ইউপিএস, ফাইজার, মারেক ও জনসন অ্যান্ড জনসন। এসব কোম্পানি ইবিআইটিডিএ পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গেছে।

মুনাফার অংক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো হালনাগাদ থাকার কিছু কৌশল অবলম্বন করেছে। ম্যাট পারসন বলেন, যেসব কোম্পানি তাদের মার্জিন রক্ষা বা বাড়াতে পেরেছে, তারা সফলভাবে পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শনাক্ত ও বোঝার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা যুগোপযোগী করেছে।

উল্লেখ্য, ইওয়াই-পারথেনন এমন সময় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি প্রচলিত বৈশ্বিক ব্যবসাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত এপ্রিলে ট্রাম্প রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চালু করেন, যার অধীনে অধিকাংশ দেশের ওপর ১০-৫০ শতাংশ হারে শুল্ক প্রস্তাব করেন তিনি। এটি এখন সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও পরিবর্তিত হারে আগামী মাস থেকে কার্যকর হতে পারে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে।

আরও